প্রবাস থেকে ফিরে কোয়েল খামার, শামীমের মাসিক আয় এখন ৩ লাখ টাকা
Published : ১৭:৩৩, ১৭ আগস্ট ২০২৬
সৌদি আরবের প্রবাসজীবন ছেড়ে দেশে ফিরে কোয়েল পাখির খামার গড়ে এখন সফল উদ্যোক্তা টাঙ্গাইলের সখীপুরের শামীম আল মামুন। মাত্র ৫০০ কোয়েল দিয়ে শুরু করা খামারে বর্তমানে রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার প্রজননক্ষম মা কোয়েল। প্রতিমাসে প্রায় ২ লাখ কোয়েলের বাচ্চা সরবরাহ করে তার আয় এখন প্রায় ৩ লাখ টাকা।
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কচুয়া গ্রামের উদ্যোক্তা শামীম আল মামুন। প্রবাসে থাকার সময় ইউটিউব, ফেসবুক ও টেলিভিশনে কোয়েল খামারের বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখে তার মনে খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন জাগে।
জীবিকার তাগিদে ২০০৫ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শামীম। সেখানে একটি পানির কারখানায় কাজ করতেন তিনি। একদিন টেলিভিশনে শাইখ সিরাজের উপস্থাপনায় কোয়েল খামার নিয়ে একটি প্রতিবেদন দেখে কোয়েল পালনের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
ছয় বছরের প্রবাসজীবন শেষে ২০১১ সালে দেশে ফিরে আসেন শামীম। এরপর বগুড়ায় গিয়ে অভিজ্ঞ খামারিদের কাছ থেকে হাতে-কলমে কোয়েল পালন ও ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ নেন।
পরের বছর ২০ শতাংশ জমির ওপর মাত্র ৫০০টি কোয়েলের বাচ্চা দিয়ে শুরু করেন ‘সোনার বাংলা সোনালী অ্যান্ড কোয়েল হ্যাচারি’। শুরু থেকেই তার স্ত্রীও খামারের কাজে সহযোগিতা করেন। কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় মাত্র তিন বছরের মধ্যে খামারে কোয়েলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজারে।
বর্তমানে শামীমের খামারে প্রায় ১৬ হাজার প্রজননক্ষম মা কোয়েল রয়েছে। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার হ্যাচিং ডিম সংগ্রহ করা হয়। এসব ডিম ইনকিউবেটরে প্রায় ১৭ দিন রাখার পর বাচ্চা ফোটানো হয়।
প্রতি মাসে প্রায় ২ লাখ কোয়েলের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিদের কাছে সরবরাহ করেন তিনি। প্রতিটি বাচ্চা ৭ থেকে ৮ টাকা দরে বিক্রি করেন। প্রতি বাচ্চায় গড়ে ২ থেকে ৩ টাকা লাভ থাকে। সব মিলিয়ে বর্তমানে তার মাসিক আয় প্রায় ৩ লাখ টাকা।
তবে এই সাফল্যের পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০২০ সাল পর্যন্ত কোয়েল ও ডিম বিক্রির ব্যবসা ভালো চললেও করোনাকালে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন শামীম। অনেক খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিলেও তিনি নতুন সম্ভাবনার পথ খুঁজতে থাকেন।
এরপর ২০২৩ সালে নিজস্ব কোয়েল হ্যাচারি চালু করেন। হ্যাচারি চালুর পর ব্যবসায় নতুন গতি আসে। বর্তমানে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে জেনারেটর এবং নিজস্ব ফিড তৈরির মেশিনও স্থাপন করেছেন তিনি।
শামীমের সফলতা দেখে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্যোক্তা ও আগ্রহীরা তার খামার পরিদর্শনে আসছেন। তাদের কোয়েল পালন সম্পর্কে পরামর্শও দিচ্ছেন তিনি।
খামার দেখতে আসা জুয়েল মিয়া বলেন, অল্প পুঁজি দিয়ে কোয়েল খামার করে শামীম দ্রুত স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে তিনিও খামার করার পরিকল্পনা করছেন।
আরেক দর্শনার্থী জুনাইদ হোসেন বলেন, শামীমের খামার দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং কোয়েল খামার শুরু করার কথা ভাবছেন।
সখীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কোয়েল পালন একটি সম্ভাবনাময় ও লাভজনক খাত। লেয়ার জাতের কোয়েল ডিম থেকে ফোটার ৬ থেকে ৭ সপ্তাহের মধ্যে ডিম দেওয়া শুরু করে এবং প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। অন্যদিকে ব্রয়লার জাতের কোয়েল প্রায় চার সপ্তাহের মধ্যেই বাজারজাত করা সম্ভব।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, কোয়েলের ডিম ও মাংস পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং বাজারে চাহিদা থাকায় কোয়েল পালন লাভজনক হতে পারে।
তিনি বলেন, আত্মকর্মসংস্থানের জন্য অনেকেই কোয়েল পালনকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। আগ্রহীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সরকারি সহযোগিতা দেওয়ারও আশ্বাস দেন তিনি। বেকার যুবকদের শামীম আল মামুনের মতো কোয়েল পালনের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শও দেন এই কর্মকর্তা।



































