রাউজানে আতঙ্কের শাসন, খুনের পর বদলে যায় এলাকার নিয়ন্ত্রণ

রাউজানে আতঙ্কের শাসন, খুনের পর বদলে যায় এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৩:৪৫, ১১ আগস্ট ২০২৬

চট্টগ্রামের রাউজানের গরিবউল্লাহ পাড়ায় ঢোকার আগে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের ভাবতে হয়, গাড়িতে থাকা যাত্রী কারা, তাঁরা কোথায় যাবেন এবং সংশ্লিষ্ট বাড়ির পরিচিত কেউ আছেন কি না। কারণ, পাড়ায় ঢোকার পথে দুই পক্ষের সশস্ত্র লোকজন গাড়ি থামিয়ে চালক ও যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

গত বছরের ১৯ এপ্রিল রাতে এই এলাকার ভান্ডারি কলোনিতে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় প্রবাসফেরত যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহকে। ওই ঘটনার পর তাঁর পরিবার বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা হত্যাকারীদের কাউকে কাউকে চিনলেও ভয়ে তাঁদের নাম প্রকাশ করতে চান না।

এক প্রতিবেশীর ভাষায়, ‘এখানে কথা বলার মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা।’

গরিবউল্লাহ পাড়ার বাইরে রাউজানের আরও কয়েকটি এলাকায়ও একই ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ঈশান ভট্টের হাটে স্ত্রী-সন্তানের সামনে যুবদল নেতা মো. সেলিমকে, পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে বহু মানুষের উপস্থিতিতে মাসুদুল হক চৌধুরীকে এবং গাজীপাড়া ও পশ্চিম রাউজানে মুহাম্মদ ইব্রাহিম ও আলমগীর আলমকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের সবাই যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডে হামলার ধরনও প্রায় একই। মোটরসাইকেল কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এসে অস্ত্রধারীরা প্রকাশ্যে গুলি চালায়। এরপর পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে যায় তারা। হত্যাকাণ্ডের পর স্বজনেরা বাড়ি ছাড়েন, প্রত্যক্ষদর্শীরা নীরব হয়ে যান এবং ধীরে ধীরে ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণও বদলে যায়।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাউজানে অন্তত ২৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। এসব হত্যাকাণ্ডের অন্তত ১৬টির সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও রাউজানকেন্দ্রিক ছয়টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাউজানে সংঘাতের পেছনে শুধু রাজনৈতিক বিরোধই নয়, বাজারের চাঁদাবাজি, বালুমহাল, নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা এবং বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসবকে কেন্দ্র করে এলাকায় গড়ে উঠেছে এক ধরনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনেও।

নোয়াপাড়ার এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে মানুষ প্রজার মতো। সন্ত্রাসীরাই রাজা।’

চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে রাউজানের ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক বলে মনে করেন স্থানীয়রা। পশ্চিমে হালদা নদী, দক্ষিণে কর্ণফুলী এবং পূর্বদিকে রাঙ্গুনিয়া ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় রয়েছে। নদী, পাহাড় ও প্রধান সড়কের সংযোগ থাকায় হামলার পর বিভিন্ন পথে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি রাউজানের গরিবউল্লাহ পাড়া থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া ১৫টি স্থান ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা, নিহতদের স্বজন, ব্যবসায়ী, সিএনজিচালক ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে পাহাড়তলী চৌমুহনী, কদলপুরের ঈশান ভট্টের হাট ও আশরাফ শাহর মাজার, রাউজান সদর ইউনিয়নের গাজীপাড়া, পৌরসভা, অলিমিয়ার হাট, পূর্ব গুজরা, মদুনাঘাট ও নোয়াপাড়া।

এ ছাড়া স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন কিংবা তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজ রাখেন—এমন কয়েকজনের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, রাউজানের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রভাব আশপাশের এলাকা ছাড়িয়ে চট্টগ্রাম নগরীতেও বিস্তৃত। এসব আলোচনায় মোহাম্মদ রায়হানের নাম সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে।

তল্লাশির মুখে সিএনজি চালকরা

গরিবউল্লাহ পাড়ার তিনজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক জানান, পাড়াটিতে যাত্রী নিয়ে প্রবেশের সময় তাঁদের একাধিকবার তল্লাশির মুখে পড়তে হয়েছে। কখনো কখনো গালাগালেরও শিকার হতে হয়েছে।

এক চালক বলেন, ‘যাত্রী নিয়ে গেলেও ভয় লাগত। দুই পক্ষই গাড়ি থামাত। ভুল লোকের নাম বললে বিপদ।’

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক আধিপত্য ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে গরিবউল্লাহ পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের বিরোধ রয়েছে। এক পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন যুবদল নেতা আরাফাত মামুন। তিনি বাগোয়ান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এলাকার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে প্রবাসফেরত যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহকে বাধা হিসেবে দেখা হতো বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন।

ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম হত্যা মামলায় গত বছরের ৪ মার্চ আরাফাত মামুন গ্রেপ্তার হন। এর পরের মাসেই নিজ বাড়িতে গুলিতে নিহত হন মানিক আবদুল্লাহ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ধারণা, মানিক হত্যাকাণ্ডে মামুনের অনুসারীদের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে দায় নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভরশীল।

মানিকের পাশের বাড়ির বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের এতদিন পরও এলাকায় আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি। মানিকের পরিবার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাঁদের বসতঘরটি এখনো ফাঁকা পড়ে আছে।

রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, গোলাগুলি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। হত্যাকাণ্ডের পর শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকার সামাজিক পরিবেশেই তৈরি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক ও নীরবতা।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement