প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে হেফাজতের ৯ দফা দাবি
Published : ১৪:০৮, ১১ আগস্ট ২০২৬
ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের কাছে দেওয়া দাবির সংখ্যা কমিয়ে এনেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ২০১৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে ১৩ দফা দাবি তুলে আলোচনায় আসা সংগঠনটি এবার বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ৯ দফা দাবি জানিয়েছে।
গত রোববার প্রধানমন্ত্রী সরকারি সফরে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে যান। সফরের কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে হেফাজতের পক্ষ থেকে ধর্মীয় ও বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে ৯ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
নতুন দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘হেযবুত তওহীদ’ নামের সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা। হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, তাঁদের মতে সংগঠনটি ইসলামকে বিকৃত করছে এবং বিভিন্ন ধরনের ফিতনা ছড়াচ্ছে। দেশের জন্য হুমকি বিবেচনায় সংগঠনটি নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে।
হেফাজতের এবারের দাবিতে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতির কার্যকর বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মীয় শিক্ষকের যোগ্যতা হিসেবে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনা, ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি করা হয়েছে।
১৩ দফা থেকে ৯ দফা
২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজপথে সক্রিয় হয়ে ওঠে হেফাজতে ইসলাম। সে সময় সংগঠনটি সরকারের কাছে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরে।
ওই দাবির মধ্যে সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন, কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন বাতিল এবং ইসলাম, আল্লাহ ও মহানবী (সা.)-এর অবমাননার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধানসহ বিভিন্ন বিষয় ছিল।
২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের সবচেয়ে আলোচিত কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথে অবস্থান নিয়ে পরে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জড়ো হন। দিনভর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শাপলা চত্বরে অভিযান চালায়। ওই ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং পরবর্তীতে হেফাজত এটিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে দাবি করে।
এবার বাদ পড়েছে যে দাবি
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেওয়া ১২ দফা দাবির মধ্যে সংবিধানের মূলনীতিতে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপনের বিষয়টি ছিল। তবে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দেওয়া ৯ দফায় সেই দাবি রাখা হয়নি।
হেফাজত নেতা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধানের মূলনীতিতে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ সংযোজনের কথা জানিয়েছে। এ বিষয়ে সংসদে বিল পাস হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। সে কারণে দাবিটি নতুন করে উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়নি।
তবে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত কোনো বিল এখন পর্যন্ত সংসদে উত্থাপিত হয়নি বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষ কমিটি কাজ শুরু করেছে।
শাপলা চত্বর ও জুলাইয়ের বিচার
এবারের ৯ দফায় শাপলা চত্বরের পাশাপাশি ২০২১ সালের মোদি-বিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া হয়েছে।
হেফাজতের দাবিতে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ২০২১ সালে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতায় আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, নির্দেশদাতা ও হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
হেফাজতের নেতাদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বৃদ্ধির আগের দাবিটি এবার আলাদাভাবে রাখা হয়নি। তাঁদের মতে, ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং হেফাজত-সংশ্লিষ্ট একটি মামলা ট্রাইব্যুনাল-২-এ রয়েছে।
দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতির বাস্তব প্রয়োগ
হেফাজতের এবারের দাবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতির কার্যকর বাস্তবায়ন।
সংগঠনটির দাবি, কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদ স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতি পাওয়ার পরও চাকরি ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাই সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট পদগুলোর শিক্ষাগত যোগ্যতার তালিকায় দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমান হিসেবে উল্লেখ করার দাবি জানানো হয়েছে।
২০১৮ সালে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে আরবি সাহিত্য ও ইসলামি শিক্ষায় মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার পর এ নিয়ে কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনে বড় ধরনের আয়োজনও হয়েছিল।
ধারাবাহিক দাবিগুলোও রয়েছে
২০১৩ থেকে বিভিন্ন সময়ে হেফাজতে ইসলাম সরকারের কাছে একাধিক দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন স্তরে ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম’ ঘোষণার দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামে মিশনারিদের কার্যক্রম বন্ধ, হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভী ও তাঁর অনুসারীদের অংশগ্রহণ বন্ধের মতো দাবিও রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও ১২ দফা দাবি জানিয়েছিল হেফাজতে ইসলাম। এবার বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ৯ দফা দাবি উত্থাপন করল সংগঠনটি।
দাবির সংখ্যা ১৩ থেকে ৯-এ নেমে এলেও হেফাজতের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও শিক্ষাসংক্রান্ত অবস্থানের বড় অংশই বহাল রয়েছে। তবে নতুন দাবিতে ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক ঘটনাবলির বিচার, সংগঠন নিষিদ্ধ করা এবং কওমি শিক্ষার স্বীকৃতির কার্যকর বাস্তবায়নের মতো বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।


































