খুলনায় কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক খুন-গুলি, বাড়ছে আতঙ্ক

খুলনায় কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক খুন-গুলি, বাড়ছে আতঙ্ক ছবি: সংগৃহীত

খুলনা প্রতিনিধি

Published : ১২:৫২, ২০ আগস্ট ২০২৬

খুলনায় অপরাধের ঘটনা যেন নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একের পর এক খুন, গুলি, ধারালো অস্ত্রের হামলা ও গণপিটুনির ঘটনায় নগর ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক প্রাণহানির ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—অপরাধীরা কি ক্রমেই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে বুধবার (১৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় নগরীর লবণচরা থানাধীন আশিবিঘা কালভার্ট এলাকায়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেখানে দুই যুবক খুন হন। নিহতরা হলেন মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) ও নাজমুল ইসলাম (১৮)।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে প্রথমে হামলার শিকার হন মঞ্জুরুল ইসলাম। তিনি পেশায় সেন্টারিং মিস্ত্রি ছিলেন। স্থানীয় খোকন সানার ছেলে মঞ্জুরুলকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়।

প্রথম হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একই এলাকার কাছাকাছি আবারও গুলির শব্দ শোনা যায়। এবার হামলার শিকার হন ১৮ বছর বয়সী নাজমুল ইসলাম। তার বাবার নাম মনির শেখ। একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই যুবকের হত্যাকাণ্ডে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষের চলাচলে যেখানে স্বাভাবিক ব্যস্ততা থাকার কথা, সেখানে এখন অনেকেই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে—কে কখন হামলার শিকার হন, সেই ভয়।

কয়েক দিনে একাধিক সহিংস ঘটনা

খুলনা ও আশপাশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আসে।

গত ১১ আগস্ট রাতে রূপসার নৈহাটী ইউনিয়নে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রূপসা ব্রিকসের কার্যালয়ে গুলিতে নিহত হন ফখরুল ইসলাম (৩২)। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইব্রাহিম কাটাপ্পা নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

১৫ আগস্ট রূপসার আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনীমহল শহীদের মোড়ে জয় ঢালী নামে এক যুবককে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি আকতার ঢালীর ছেলে।

এরপর ১৮ আগস্ট রাতে রূপসার নৈহাটী প্রতিবন্ধী স্কুলের সামনে গুলিবিদ্ধ হন মামুন মীর (৩৫)। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। অস্ত্রোপচার করা হলেও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

একই দিন দুপুরে রায়েরমহল এলাকায় চার বছরের শিশু মিমকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে স্থানীয়দের গণপিটুনির শিকার হন রাজু (২৬)। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।

এর পর আশিবিঘা কালভার্ট এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই যুবকের হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

কী কারণে বাড়ছে সহিংসতা?

পরপর এসব ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠছে। অপরাধীরা কীভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করে দ্রুত হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে? অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার কি বাড়ছে? নাকি পূর্ববিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধীচক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেই এসব ঘটনা ঘটছে?

তবে এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। পুলিশ বলছে, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।

লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোশাররফ হোসেন জানান, একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই যুবক গুলিতে নিহত হয়েছেন। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।

খুলনা সদর থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষ ব্যবস্থা চায় নাগরিক সমাজ

পরপর সহিংস ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার। তিনি বলেন, খুলনা শহরে বর্তমানে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

তার দাবি, খুলনাকে সন্ত্রাসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করা, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তালিকা করে গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর অভিযান চালানো প্রয়োজন।

নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু পৃথক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়—অপরাধের উৎস, অস্ত্রের সরবরাহ এবং এসব ঘটনার পেছনে থাকা চক্রগুলো শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারণ, একটি হত্যাকাণ্ডের পর আরেকটি হত্যাকাণ্ড এবং একটি গুলির ঘটনার পর আরেকটি গুলির ঘটনা যখন ধারাবাহিকতায় পরিণত হয়, তখন তা শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান থাকে না; নগরবাসীর নিরাপত্তাবোধের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

খুলনার মানুষের এখন প্রশ্ন—পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা ঘটার আগেই কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই ধারাবাহিকতার কারণ ও উৎস শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে?

শেয়ার করুনঃ
Advertisement