অ্যাকাউন্ট না খুলেও আসামি, লাখ লাখ টাকা লেনদেন

অ্যাকাউন্ট না খুলেও আসামি, লাখ লাখ টাকা লেনদেন ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

Published : ১০:৪৬, ১৫ আগস্ট ২০২৬

সরকারি বাঙলা কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান হাফিজের অজান্তে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ছবি, স্বাক্ষর ও ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে সিটি ব্যাংকে একটি হিসাব খোলার অভিযোগ উঠেছে। ওই হিসাবে মাত্র এক মাসে ২৪ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। পরে হিসাবটি ফ্রিজ করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ৬ জুন। সেদিন অপরিচিত একটি নম্বর থেকে ফোন করে এক ব্যক্তি নিজেকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপপরিদর্শক (এসআই) সুমিত দাশ পরিচয় দিয়ে ইমরানকে জানান, তাঁর নামে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা হয়েছে। সিটি ব্যাংকে তাঁর নামে একটি হিসাব রয়েছে এবং সেখানে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও জানানো হয়। হিসাবটি খোলার সময় ইমরানের নামে একটি ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

ইমরান জানান, তাঁর নামে সিটি ব্যাংকে কোনো হিসাব নেই এবং তিনি কখনো ওই ব্যাংকে যাননি। তাঁর নামে কোনো ট্রেড লাইসেন্স থাকার কথাও তিনি জানেন না। এরপর ১২ জুলাই আরেক ব্যক্তি নিজেকে উত্তরা পূর্ব থানার এএসআই বুলবুল পরিচয় দিয়ে একই ব্যাংক হিসাবের বর্তমান ঠিকানা সম্পর্কে তাঁকে জানান। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পরিবারকে জানান ইমরান।

এরপর ১৫ জুলাই তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশের একজন কর্মকর্তা তাঁর সাতক্ষীরার স্থায়ী ঠিকানায় গেলে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। পরে ইমরান সিটি ব্যাংকের মিরপুর-১ শাখায় গিয়ে খোঁজ নিলে শাখা ব্যবস্থাপক তাঁকে জানান, তাঁর নামে ব্যাংকটিতে কোনো হিসাব নেই।

এক মাসে ২৪ লাখ টাকার বেশি লেনদেন

ব্যাংক থেকে পাওয়া নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল সিটি ব্যাংকের গুলশান-১৩০ শাখায় ওই হিসাব খোলা হয় এবং ৯ এপ্রিল তা অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৪ এপ্রিল থেকে লেনদেন শুরু হয়। একই মাসের ২৯ এপ্রিল বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়।

এর মধ্যে আরটিজিএসের মাধ্যমে মেসার্স এমএম ফারুকী এন্টারপ্রাইজ থেকে ১৯ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা ওই হিসাবে জমা হয়। পরে একই দিনে এনপিএসবির মাধ্যমে ছয়টি পৃথক ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। পুরো এপ্রিল মাসে হিসাবটিতে ২৪ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।

বর্তমানে হিসাবটি ফ্রিজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ভুয়া পরিচয়ে ব্যবসায়ী সাজানো হয় ইমরানকে

হিসাব খোলার আবেদনপত্রে ইমরান হাফিজকে ব্যবসায়ী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাঁর মাসিক আয় উল্লেখ করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। অথচ ইমরান একজন কলেজ শিক্ষার্থী এবং টিউশনি করে মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা আয় করেন বলে জানিয়েছেন।

হিসাব খোলার ফরমে ‘ফাহাদ টেলিকম’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা উল্লিখিত ঠিকানার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া হিসাবধারীর মোবাইল নম্বর হিসেবে যে নম্বরটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সালাহ উদ্দিন আকনের নামে নিবন্ধিত। তিনি ইমরানকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন।

ব্যাংক হিসাবের নমিনি হিসেবে গাইবান্ধার ফেনসি আক্তারকে ইমরানের ‘আন্টি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ইমরান জানান, ওই নারীকে তিনি কখনো চেনেন না এবং তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।

এনআইডির ছবি ব্যবহার করে তৈরি করা হয় নতুন ছবি

ইমরানের অভিযোগ, তাঁর এনআইডি থেকে ছবি সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে টাই-কোট পরিহিত নতুন ছবি তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে হিসাব খোলার নথিতে ব্যবহৃত স্বাক্ষরও তাঁর প্রকৃত স্বাক্ষরের সঙ্গে মেলে না।

এ ছাড়া তাঁর অজান্তে ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ‘ফাহাদ টেলিকম’ নামে একটি ই-ট্রেড লাইসেন্সও খোলা হয়। ওই লাইসেন্সে এমন ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে, যার বাস্তব অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি।

ব্যাংকের কর্মকর্তার বক্তব্য

সিটি ব্যাংকের রিটেইল কর্মকর্তা রেজাউল কবির বলেন, হিসাবটি তিনি খুলেছেন এবং ইমরান হাফিজ তাঁর ক্লায়েন্ট। তাঁর দাবি, ইমরান নিজে এসে স্বাক্ষর করেছেন এবং চেকবই নিয়েছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাবেন বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, মো. সালাহ উদ্দিন আকন বলেন, তাঁর মোবাইল নম্বর কীভাবে ওই ব্যাংক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

পুলিশের তদন্ত

ঘটনাটি বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তাধীন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে সাইবার পিটিশন মামলা নম্বর ২৩/২০২৫ দায়ের হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।

সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের ডিসি মো. শামীম হোসেন বলেন, তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ ও অভিযুক্তদের শনাক্ত করা গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানার এএসআই ফজলুল করিম জানান, ইমরানের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিচয় ও স্থানীয় অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে ইমরান সম্পর্কে নেতিবাচক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কারও এনআইডি ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তাঁর অজান্তে ব্যাংক হিসাব খোলা গুরুতর অপরাধ ও জালিয়াতি। এর মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন যেমন হতে পারে, তেমনি নিরপরাধ ব্যক্তিকেও বিপদে ফেলা সম্ভব।

আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ব্যাংক কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ যাচাই ছাড়া অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে হিসাব খোলা সম্ভব হওয়ার কথা নয়। এ ধরনের ঘটনা ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, তথ্যের অপব্যবহার এবং গ্রাহকের পরিচয় যাচাইয়ে ব্যর্থতার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের প্রত্যেকের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, ঘটনাটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার KYC প্রক্রিয়া ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার দুর্বলতাও সামনে এনেছে।

এ ঘটনায় এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি—ইমরানের উপস্থিতি ছাড়া কীভাবে তাঁর নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হলো, KYC যাচাই কীভাবে সম্পন্ন হলো, ভুয়া ছবি-স্বাক্ষর ও ট্রেড লাইসেন্স কীভাবে যাচাইয়ে পাস করল এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র কিংবা ব্যাংকের ভেতরের কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না। তদন্ত শেষ হলে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement