চীনে বাংলাদেশি নারীদের পারিবারিক ভিসা বৃদ্ধি, প্রতারণা ও পাচারের ঝুঁকি খতিয়ে দেখার তাগিদ

চীনে বাংলাদেশি নারীদের পারিবারিক ভিসা বৃদ্ধি, প্রতারণা ও পাচারের ঝুঁকি খতিয়ে দেখার তাগিদ প্রতীকী ছবি

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ২১:৪৭, ২৩ আগস্ট ২০২৬

বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করে নতুন জীবনের আশায় চীনে যাওয়া বাংলাদেশি নারীদের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর বড় অংশই পারিবারিক পুনর্মিলনের কিউ–১ ভিসার মাধ্যমে চীনে যাচ্ছেন। বৈধ পারিবারিক অভিবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই যাত্রা স্বাভাবিক হলেও, বিদেশে বিয়ে ও উন্নত জীবনের প্রলোভনকে কেন্দ্র করে প্রতারণা বা মানবপাচারের কোনো ঘটনা ঘটছে কি না, তা নিয়ে সতর্কতা ও কার্যকর নজরদারির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৪ হাজার ২২৬ জন বাংলাদেশি নারী চীনে যাওয়ার জন্য কিউ–১ বা পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা নিয়েছেন। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৫ জন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ১৬, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৭৮ এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৭২১ জনে দাঁড়ায়।

তবে এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি মানবপাচারের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চীনা নাগরিককে বিয়ে করা বা বৈধভাবে চীনে যাওয়া কোনো অপরাধ নয়। একইভাবে কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তার দায় পুরো চীনা জনগোষ্ঠী, নাগরিক বা বৈধভাবে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায় না।

তবে বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিদেশি নাগরিককে বিয়ে, দালালচক্রের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার প্রলোভন এবং পরবর্তীতে নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা পৃথক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের ধরন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিদেশে উন্নত জীবন, আর্থিক নিরাপত্তা, বড় বাড়িতে বসবাস কিংবা পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারীদের আকৃষ্ট করার ঝুঁকি রয়েছে। কিছু ঘটনায় ভুয়া ঠিকানা, জাল নথি এবং সন্দেহজনক বিয়ের কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।

এ অবস্থায় বিদেশি নাগরিককে বিয়ের আগে উভয় পক্ষের পরিচয়, স্থায়ী ঠিকানা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, আয় ও পারিবারিক তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সংশ্লিষ্ট নারীর স্বেচ্ছায় নেওয়া কি না এবং তিনি সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত কি না, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিস্তৃত হয়েছে। অবকাঠামো, উৎপাদন, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন শিল্পখাতে চীনা কোম্পানির উপস্থিতি রয়েছে। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ার সঙ্গে মানুষের চলাচল ও ব্যবসায়িক যোগাযোগও স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তাই বিদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের বৈধ কার্যক্রমকে সম্মান জানিয়ে একই সঙ্গে আন্তদেশীয় অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস ও গন্তব্য এবং স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই থাকা জরুরি। এই নীতি সব দেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। পুলিশ, সিআইডি, বিশেষ শাখা, ইমিগ্রেশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান থাকলে সন্দেহজনক পরিস্থিতি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

বিয়ের নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠান ও কাজির কার্যালয়ের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় যাচাই নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। জাল কাগজপত্র বা প্রতারণামূলক বিয়েতে কেউ জেনেশুনে সহায়তা করলে তার বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্তে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি জোরদার করা যেতে পারে।

তবে মানবপাচার প্রতিরোধের নামে বিদেশগামী সব নারীকে সন্দেহের চোখে দেখা সমাধান নয়। বাংলাদেশি নারীদের পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, বিয়ে কিংবা পারিবারিক কারণে বিদেশ যাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই ইমিগ্রেশন পর্যায়ে নজরদারি হওয়া উচিত নির্দিষ্ট ঝুঁকির লক্ষণ ও তথ্যের ভিত্তিতে।

চীনে গিয়ে কোনো বাংলাদেশি নারী প্রতারণা, পাচার বা নির্যাতনের শিকার হলে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করতে দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা ও তদন্তকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন। তথ্য বিনিময়, যৌথ তদন্ত, অর্থের গতিপথ অনুসরণ এবং প্রয়োজন হলে ভুক্তভোগীকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা জরুরি।

পরিবারগুলোরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিদেশে বিয়ের প্রস্তাব এলে সম্ভাব্য পাত্রের পরিচয়, স্থায়ী ঠিকানা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, আয় এবং বিয়ের মধ্যস্থতাকারীদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে ভিসা প্রক্রিয়া, বিদেশে সম্ভাব্য বসবাসের ঠিকানা এবং যাত্রার পরিকল্পনা সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

চীনে কিউ–১ ভিসায় যাওয়া ৪ হাজার ২২৬ বাংলাদেশি নারীকে মানবপাচারের শিকার হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো ভিত্তি নেই। তবে কয়েক বছরের ব্যবধানে এই ভিসা গ্রহণের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি এবং একই সময়ে বিদেশি বিয়েকে ঘিরে প্রতারণা ও নির্যাতনের অভিযোগ—দুই বিষয়ই আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্পর্ক যত গভীর হবে, ততই প্রয়োজন হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা।

সুতরাং, বৈধ পারিবারিক অভিবাসনের সুযোগ অক্ষুণ্ন রেখেই প্রতারণা ও মানবপাচারের সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি। বিদেশে বিয়ের মাধ্যমে নতুন জীবন শুরু করতে যাওয়া নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট দুই দেশের কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement