দুদকের আপত্তি সত্ত্বেও বিটিসিএলের ৫জি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ, নতুন করে চিঠি মন্ত্রণালয়ের

দুদকের আপত্তি সত্ত্বেও বিটিসিএলের ৫জি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ, নতুন করে চিঠি মন্ত্রণালয়ের ছবি : সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ০৯:৪১, ২৭ জুলাই ২০২৬

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) লিখিত আপত্তি ও চলমান অনুসন্ধানের মধ্যেই বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) বহুল আলোচিত ‘৫জির উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রকল্পটির অবশিষ্ট কার্যক্রম চালিয়ে নিতে দুদকের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে নতুন করে চিঠি পাঠিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়ন, যন্ত্রপাতি আমদানি, এলসি এবং কারিগরি মূল্যায়নসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে প্রকল্পটি চালিয়ে নেওয়ার যৌক্তিকতা উপস্থাপন করা হয়েছে। গত ৫ মে পরিকল্পনা-৩ শাখা থেকে পাঠানো ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন সিনিয়র সহকারী সচিব শুভ দেবনাথ।

দুদকের অবস্থান অপরিবর্তিত

দুদক সূত্র জানায়, এর আগে কমিশন লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছিল যে প্রকল্পটির ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই অনুসন্ধান চলাকালে অবশিষ্ট ক্রয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া আইনসিদ্ধ হবে না এবং এ খাতে ব্যয়ও আইনি জটিলতায় পড়তে পারে।

একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দুদকের অবস্থান আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে। তাই একই বিষয়ে পুনরায় চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অনুরোধকে কমিশন গুরুত্ব দিচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, অনুসন্ধান কমিটি ইতোমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ব্যয় ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক

প্রকল্পটি নিয়ে শুরু থেকেই ব্যয়, প্রয়োজনীয়তা এবং কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিটিসিএলের সম্ভাব্য ব্যান্ডউইথ চাহিদা ২৬ দশমিক ২ টেরাবাইট নির্ধারণ করা হয় এবং সে অনুযায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়।

তবে প্রকল্পে ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩২৬ কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনিয়মের অভিযোগ

দুদকের অনুসন্ধানে গোপনীয়তা ভঙ্গ, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) লঙ্ঘন, বুয়েটের সুপারিশ উপেক্ষা এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ছাড়া যন্ত্রপাতির গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হলেও, সমালোচকদের মতে প্রকৃত প্রশ্ন যন্ত্রপাতির মান নয়; বরং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতার সরঞ্জাম কেনা এবং প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর যৌক্তিকতা।

হুয়াওয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পেছনে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

হুয়াওয়ে বাংলাদেশের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস তানভীর আহমেদ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বৈধভাবে দরপত্রে নির্বাচিত হয়েছে এবং যন্ত্রপাতি সরবরাহের পরও অর্থ পরিশোধ আটকে রয়েছে।

তবে প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যন্ত্রপাতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পাঠানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পরও তদন্তাধীন প্রকল্প চালিয়ে নেওয়ার জন্য দুদকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলে তা তদন্তের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, প্রযুক্তি খাতে হুয়াওয়ে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলেও বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তিনি বাংলাদেশেও প্রকল্প-সংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

তার মতে, দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ বিষয়ে সরকারের আইনানুগ ও স্বচ্ছ অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement