হলিউডের ‘গার্ল ২৭’: ধর্ষণের অভিযোগ তুলে ক্যারিয়ার হারানো প্যাট্রিসিয়া ডগলাসের গল্প
Published : ১৯:২০, ৯ আগস্ট ২০২৬
সময়টা ১৯৩৭ সাল। হলিউড তখন স্বর্ণযুগ পার করছে। রুপালি পর্দায় ঝলমলে আলো, তারকাদের খ্যাতি আর স্টুডিওগুলোর দাপট—সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রজগৎ তখন স্বপ্নের মতো। কিন্তু সেই ঝলমলে জগতের আড়ালেই ঘটে যায় এমন এক ঘটনা, যা বহু বছর পরও হলিউডের অন্ধকার ইতিহাসের প্রতীক হয়ে আছে।
ভুক্তভোগী ছিলেন নৃত্যশিল্পী ও চলচ্চিত্রের এক্সট্রা অভিনয়শিল্পী প্যাট্রিসিয়া ডগলাস। ১৯৩৭ সালে একটি পার্টিতে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন তিনি। সে সময় এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আনা ছিল অত্যন্ত সাহসের বিষয়। কিন্তু বিচার পাওয়ার পরিবর্তে প্যাট্রিসিয়াকে মুখোমুখি হতে হয় অপমান, চরিত্রহনন ও সামাজিক চাপের।
পার্টি থেকে হাসপাতালে
১৯৩৭ সালে বিখ্যাত স্টুডিও মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার (এমজিএম) একটি করপোরেট পার্টির আয়োজন করে। অতিথিদের বিনোদনের জন্য প্যাট্রিসিয়াসহ বেশ কয়েকজন নারীকে সেখানে নাচের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্যাট্রিসিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, পার্টিতে তাকে জোর করে মদ পান করানো হয়। পরে অসুস্থ বোধ করলে তিনি বাইরে বেরিয়ে যান। সেখানেই এমজিএমের বিক্রয় বিভাগের কর্মী ডেভিড রজ তাকে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ঘটনার পরপরই হাসপাতালে যান প্যাট্রিসিয়া। চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের কাছে অভিযোগও করেন। মামলার আইনি খরচও নিজের অর্থে বহন করেন তিনি।
কিন্তু অভিযোগ করার পরই শুরু হয় তার বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচারণা।
প্রমাণের বদলে চরিত্রহনন
প্যাট্রিসিয়ার অভিযোগ ছিল, ধর্ষণের পর গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণ করার পরিবর্তে হাসপাতালে তার শরীর পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছিল। এতে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়।
এরপর সংবাদমাধ্যমে শুরু হয় তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা ধরনের প্রচার। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে উচ্ছৃঙ্খল ও চরিত্রহীন হিসেবে তুলে ধরা হয়। এমনকি তার যৌনরোগ রয়েছে—এমন দাবিও ছড়িয়ে পড়ে।
মামলাটি নিয়েও নানা প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ প্রত্যাহারের বিনিময়ে প্রসিকিউটর ঘুষ নিয়েছিলেন—এমন দাবিও সে সময় সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত মামলাটি আর এগোয়নি।
হারিয়ে যায় ক্যারিয়ার
অভিযোগের পর প্যাট্রিসিয়া ডগলাস কার্যত হলিউডে কাজের সুযোগ হারান। অনেক গবেষকের মতে, তাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে হলিউডের ‘ব্ল্যাক লিস্টে’ রাখা হয়েছিল। ফলে তার অভিনয়জীবন প্রায় শেষ হয়ে যায়।
এরপর দীর্ঘদিন তিনি জনসমক্ষে এ বিষয়ে কথা বলেননি। হলিউড থেকে দূরে সরে গিয়ে অনেকটা আড়ালেই জীবন কাটান তিনি।
কয়েক দশক পর ফিরে আসে সেই গল্প
ঘটনার বহু বছর পর পরিচালক ও লেখক ডেভিড স্টেন প্যাট্রিসিয়া ডগলাসকে খুঁজে বের করেন। শুরুতে তিনি আবারও পুরোনো ঘটনা নিয়ে কথা বলতে চাননি। তবে জীবনের শেষদিকে তিনি সাক্ষাৎকার দিতে সম্মত হন।
সেই সাক্ষাৎকার পরে ভ্যানিটি ফেয়ার-এ প্রকাশিত হয়। ২০০৩ সালে প্যাট্রিসিয়া ডগলাস মারা যান। তার মৃত্যুর পর ধারণ করা সাক্ষাৎকারের ভিডিও ২০০৭ সালে তথ্যচিত্র হিসেবে প্রকাশিত হয়।
তথ্যচিত্রটির নাম ‘গার্ল ২৭’। প্যাট্রিসিয়া ছিলেন হলিউডের ২৭ নম্বর তালিকাভুক্ত এক্সট্রা অভিনেত্রী। চলচ্চিত্রটির ট্যাগলাইন ছিল—‘৭০ বছর, টাকা এবং ক্ষমতা সত্যকে চাপা দিয়ে রেখেছিল।’
‘গার্ল ২৭’-এ শুধু প্যাট্রিসিয়ার অভিযোগের ঘটনাই নয়, হলিউডের শুরুর যুগে নারীদের প্রতি যৌন সহিংসতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সেই ঘটনাগুলো কীভাবে চাপা দেওয়া হতো—তাও তুলে ধরা হয়।
প্যাট্রিসিয়া ডগলাসের গল্প তাই শুধু একজন অভিনেত্রী বা নৃত্যশিল্পীর হারিয়ে যাওয়া ক্যারিয়ারের গল্প নয়; এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার মূল্য অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই দিতে হতো।
































