গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উৎপাদনে ধস, শতাধিক কারখানা বন্ধ
Published : ১১:২৪, ১৬ আগস্ট ২০২৬
দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে শিল্পখাত। গ্যাসনির্ভর নিত্যপণ্য, ওষুধ, সিরামিক, ইস্পাত, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। অনেক কারখানায় সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো।
শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকলেও গত সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ১০০টির বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। আরও দেড় শতাধিক কারখানায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গ্যাসের অভাবে যেসব কারখানা জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করত, তারাও অনেক ক্ষেত্রে তা চালাতে পারছে না। ফলে বয়লারনির্ভর ও গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নিত্যপণ্য উৎপাদনে বড় ধাক্কা
নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে চিনি, গম, ভোজ্যতেল ও ডালসহ নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী শতাধিক কারখানা রয়েছে। গ্যাস সংকটে এর প্রায় অর্ধেক সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। চালু থাকা কারখানাগুলোও সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ৫৭টি কারখানার মধ্যে ৪০টির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। টি কে গ্রুপের অধিকাংশ কারখানাতেও উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসিআই লিমিটেডের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি কমেছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পাইকারি বাজারেও। নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে গত তিন দিনে চিনির কোনো ট্রাক প্রবেশ করেনি। সরবরাহ কমে যাওয়ায় সেখানে চিনির দাম কেজিতে প্রায় ৭ টাকা বেড়েছে।
বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কিছু কারখানা ডিজেল ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
বিএসআরএমের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে। একইভাবে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের পাবনা ও গাজীপুরের দুটি গ্যাসনির্ভর কারখানাও ডিজেল দিয়ে সচল রাখা হয়েছে।
শিল্পমালিকেরা বলছেন, দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে শুধু কারখানা নয়, সরবরাহব্যবস্থা, শ্রমিক ও বাজার—সব পর্যায়েই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নরসিংদীতে সবচেয়ে বেশি সংকট
দেশের স্থানীয় কাপড়ের প্রায় ৭০ শতাংশ চাহিদা নরসিংদী থেকে সরবরাহ করা হয়। জেলায় টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিল রয়েছে তিন হাজারের বেশি। তীব্র গ্যাস সংকটে গ্যাসনির্ভর প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অনেক কারখানায় গড় উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।
চট্টগ্রামেও অন্তত ৩৫টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটি পুরোপুরি বন্ধ এবং বেশ কিছু কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
রপ্তানিমুখী শিল্পেও উদ্বেগ
হবিগঞ্জে শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তিন সপ্তাহ ধরে চাহিদার তুলনায় কম গ্যাস পাচ্ছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী। গত সপ্তাহে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে খুলনা অঞ্চলের হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ সংকটে বিপাকে পড়েছে। জেনারেটর চালিয়ে হিমাগার সচল রাখতে গিয়ে তাদের উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সংকট কাটেনি
টানা ২৫ দিন তীব্র সংকটের পর গতকাল দেশে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। সামিটের এলএনজি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হওয়ায় ভোর থেকে সরবরাহ বাড়তে শুরু করে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। গতকাল সন্ধ্যায় মোট সরবরাহ ছিল ২৪৪ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ স্বাভাবিক সরবরাহের তুলনায় এখনো ঘাটতি রয়েছে।
শিল্পমালিকেরা বলছেন, দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন, বাজার সরবরাহ, পণ্যের দাম ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সংকট মোকাবিলায় ভোলা থেকে সিএনজি বা বিশেষ ব্যবস্থায় গ্যাস এনে শিল্পকারখানায় সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।


































