ময়মনসিংহে এক বছরে সরকারি প্রাথমিকে কমেছে সোয়া লাখ শিক্ষার্থী

ময়মনসিংহে এক বছরে সরকারি প্রাথমিকে কমেছে সোয়া লাখ শিক্ষার্থী ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১১:৫৪, ৮ আগস্ট ২০২৬

ময়মনসিংহে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। চলতি বছর জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমেছে এক লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন। একদিকে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অল্প বয়সে কাজে যুক্ত হওয়া, অন্যদিকে মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ বাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জেলার তারাকান্দা উপজেলার পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু রায়হান এর একটি উদাহরণ। মে মাস পর্যন্ত নিয়মিত স্কুলে গেলেও জুনের শুরু থেকে সে আর বিদ্যালয়ে আসছে না। পরে শিক্ষকেরা জানতে পারেন, রায়হান ঢাকায় একটি দরজির দোকানে কাজ শিখছে।

রায়হানের বাবা আজহারুল ইসলাম দিনমজুর। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে ছেলেকে ঢাকায় কাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তার মা রেখা আক্তার। একই বিদ্যালয়ের অন্তত ১০ শিক্ষার্থী দুই মাস বা তার বেশি সময় ধরে ক্লাসে অনুপস্থিত রয়েছে।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তারও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির পর আর বিদ্যালয়ে যায়নি। তার মা জানান, মেয়ের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাকে গ্রামের একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়েছে।

এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার

ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৩টি উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২ হাজার ১৪০টি। ২০২৫ সালে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন। চলতি বছর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে।

অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, অভিভাবকদের বড় একটি অংশ সন্তানদের মাদ্রাসা, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। এ কারণেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে এ প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে জানান তিনি।

ঝরে পড়ায় শীর্ষে গফরগাঁও, দ্বিতীয় তারাকান্দা

চলতি বছর ময়মনসিংহ জেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। উপজেলার হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঝরে পড়ার হার গফরগাঁওয়ে—প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এরপরই রয়েছে তারাকান্দা, যেখানে ঝরে পড়ার হার ৪ শতাংশ।

গফরগাঁওয়ে ২০২০ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৬০ হাজার ৮১৫ জন। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ২৭ জনে।

শিক্ষকদের মতে, অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ কমে যাওয়া, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অল্প বয়সে কাজে যুক্ত হওয়া এবং মাদ্রাসামুখী প্রবণতা শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ।

শূন্য প্রধান শিক্ষকের পদ ৫৮ শতাংশ

শুধু শিক্ষার্থী কমে যাওয়াই নয়, শিক্ষক সংকটও ময়মনসিংহের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বড় সমস্যা। জেলার ২ হাজার ১৪০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১ হাজার ২৪২টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১১ হাজার ৯০২টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ১১ হাজার ৪৯ জন। ফলে ৮৫৩টি পদও খালি রয়েছে।

সদর উপজেলার পয়েস্তিরচর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন। শিক্ষক সংকটের কারণে একসঙ্গে একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী ১১২ জন, যেখানে ২০১৮ সালে ছিল ২২৩ জন।

কোথাও সময়ের আগেই ছুটি

শিক্ষক সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমেও। মুক্তাগাছা উপজেলার গোলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। আবার বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক উপজেলা সদরের সভায় গেলে কার্যত একজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় চালাতে হয়।

সম্প্রতি বিকেল সোয়া ৩টার দিকে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়, যদিও নির্ধারিত ছুটির সময় ছিল বিকেল সোয়া ৪টা।

একই উপজেলার বিন্নাকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও সাতজন শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছেন চারজন। প্রধান শিক্ষক উপজেলা সদরের সভায় গেলে নির্ধারিত সময়ের আগেই শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় দুটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুল আমীন।

জরাজীর্ণ ১৮৭ বিদ্যালয় ভবন

ময়মনসিংহে শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২৭টি বিদ্যালয়ে এখনো টিনশেড ভবনে পাঠদান চলছে। আরও ১৮৭টি বিদ্যালয় ভবন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

সদর উপজেলার ঝাপারকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি টিনশেড ভবনে চলছে পাঠদান। গরমের কারণে সেখানে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে সমস্যা হয় বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

বিদ্যালয়টিতে ২০১৭ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২৪০ জন। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০৭ জনে।

উদ্বিগ্ন শিক্ষা কর্মকর্তারা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মনে করছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, অভিভাবকদের নিজস্ব পছন্দ ও অগ্রাধিকার রয়েছে। কেউ সন্তানকে কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারি বিদ্যালয় কিংবা মাদ্রাসায় পড়াতে চাইছেন। করোনা-পরবর্তী সময়ে এ প্রবণতা আরও বেড়েছে।

তবে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রভাব ভবিষ্যতে মাধ্যমিক শিক্ষাতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষকরা। তাঁদের মতে, ঝরে পড়ার কারণ চিহ্নিত করে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত করা, শিক্ষক তদারকি বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement