বিএনপি সরকারে জায়গা হয়নি বহু পরীক্ষিত নেতার

বিএনপি সরকারে জায়গা হয়নি বহু পরীক্ষিত নেতার ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৪:৩৩, ৮ আগস্ট ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় দলের দীর্ঘদিনের বেশ কয়েকজন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা এখনো জায়গা পাননি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, জয়নুল আবদিন ফারুক, রুহুল কবির রিজভী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ আরও কয়েকজন পরিচিত নেতা।

দীর্ঘ সময় ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলন, মামলা, গ্রেপ্তার, কারাভোগ ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে দলের রাজনীতি ধরে রাখায় এসব নেতার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। তাঁদের অনেকে রাজপথের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিএনপির পক্ষে সক্রিয় ছিলেন।

তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভায় নতুন ও অপেক্ষাকৃত তরুণ মুখের প্রাধান্য দেখা গেলেও রাজপথের দীর্ঘদিনের এসব নেতার অনেকেই কাঙ্ক্ষিত পদে না থাকায় দলের তৃণমূলে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়

বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে সামনের সারিতে ছিলেন। পুলিশি বাধা, হামলা ও টিয়ারশেলের মুখেও তাঁকে নিয়মিত রাজপথে দেখা গেছে। ২০২৩ সালে পুরান ঢাকার ধোলাইখালে বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশের হামলায় তিনি আহত হন।

ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া গয়েশ্বর ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের আহ্বানে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন। দীর্ঘ সাংগঠনিক পথ পেরিয়ে তিনি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও মন্ত্রিসভায় জায়গা হয়নি তাঁর।

রুহুল কবির রিজভী

বিএনপির দুঃসময়ে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক দলীয় কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন রুহুল কবির রিজভী। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন তিনি।

রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাভোগ করেছেন বিএনপির এই নেতা। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। মন্ত্রিসভায় জায়গা না হলেও মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।

শামসুজ্জামান দুদু

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুও দীর্ঘদিন ধরে দলের অন্যতম সোচ্চার মুখ হিসেবে পরিচিত। টেলিভিশন টকশো, সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিয়মিত দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।

বিরোধী দলে থাকাকালে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাভোগের পাশাপাশি দলের কঠিন সময়ে মুখপাত্রের ভূমিকাও পালন করেছেন। তবে সংসদে বা সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও মন্ত্রিসভায় স্থান হয়নি তাঁর।

জয়নুল আবদিন ফারুক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ষষ্ঠবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা জয়নুল আবদিন ফারুক। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী দলের চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সংসদ ভবনের সামনে পুলিশি হামলার শিকার হয়ে তিনি আলোচনায় আসেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার পরও মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়ায় তাঁর অনুসারীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তবে জয়নুল আবদিন ফারুক বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিয়ে বলেছেন, বিএনপি একটি বড় দল এবং সবাইকে একসঙ্গে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে মূল্যায়ন করবেন বলে তিনি আশা করেন।

সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজপথ ও গণমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে বহু মামলা হয় এবং একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে।

মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও সংগঠনের প্রতি নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে।

হাবিব-উন-নবী খান সোহেল

বিএনপির রাজপথের আন্দোলনে পরিচিত মুখ হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। ঢাকা মহানগর বিএনপির দায়িত্বে থাকার সময় তাঁর বিরুদ্ধে শত শত রাজনৈতিক মামলা হয়। দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকা এবং কারাভোগের মধ্যেও তিনি দলীয় কর্মীদের সংগঠিত রাখার চেষ্টা করেছেন।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার সময়ও তিনি দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সরকার গঠনের পর্যায়েও তাঁর নাম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের তালিকায় না থাকায় দলের ভেতরে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আরও কয়েকজন আলোচনায়

মন্ত্রিসভা ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বাইরে থাকা নেতাদের তালিকায় আরও রয়েছেন সাইফুল আলম নীরব, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, ফজলুর রহমান খোকন, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ এবং ইকবাল হোসেন শ্যামল।

এদের অনেকেই বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। কেউ দীর্ঘদিন মামলা ও কারাভোগ করেছেন, কেউ সংগঠনের কঠিন সময়ে কর্মীদের সংগঠিত রেখেছেন। তবে নির্বাচনে মনোনয়ন বা সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পদ না পাওয়ায় তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

ত্যাগীদের মূল্যায়নের প্রত্যাশা

বিএনপি নেতাদের একাংশ মনে করেন, গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে যারা দলীয় আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের সাংগঠনিক ও সরকারি বিভিন্ন দায়িত্বে পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর মতে, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে বিএনপির বহু নেতাকর্মী চাকরি হারিয়েছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং দীর্ঘদিন কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁর আশা, প্রধানমন্ত্রী ধাপে ধাপে এসব ত্যাগী নেতাকে মূল্যায়ন করবেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানও দলের দুঃসময়ে নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সাংগঠনিক দায়িত্ব, বিভিন্ন সরকারি পদ এবং স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে মনোনয়নের মাধ্যমেও ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা সম্ভব।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় যারা দলকে সংগঠিত রেখেছেন, ক্ষমতায় আসার পর তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যায়। নতুন সরকারে দক্ষতা ও নতুন মুখকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতাদের প্রত্যাশা পূরণ না হলে দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement