রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নামই জোরালো
Published : ১১:৪০, ১২ আগস্ট ২০২৬
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে তার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে।
মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ থেকে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব পদেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে দলীয় সূত্রে আলোচনা রয়েছে।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি হওয়ায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। গত কয়েক সপ্তাহের আলোচনা, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠক এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতায় মির্জা ফখরুলের নাম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এখনো বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় আসার পর মঙ্গলবার সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড় দেখা যায়। অনেকে তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তবে বিষয়টি নিয়ে মির্জা ফখরুলকে খুব বেশি উৎসাহী হতে দেখা যায়নি। শুভেচ্ছা জানাতে আসা ব্যক্তিদের তিনি বলেন, ‘আগে হোক, তারপর।’
এরপরও তিনি সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত সচিবালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বেইলি রোডের সরকারি বাসভবনেও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড় দেখা যায়।
বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমা
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন।
ভোটগ্রহণ হবে ২০ আগস্ট। ওই দিন জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট হবে।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে শেষ কর্মদিবস আজ অথবা বৃহস্পতিবার হতে পারে। তবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কিছু দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকতে পারে।
আরও যাদের নাম আলোচনায়
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী বাছাই নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গত কয়েক দিনে একাধিক নাম আলোচনা হয়েছে। মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আবদুল মঈন খানের নামও আলোচনায় এসেছে।
তবে দলীয় সূত্র, রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনা এবং সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত ১ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়। বৈঠক শেষে বিষয়টি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল নিজেই।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা
দলের ভেতরে মির্জা ফখরুলের নাম গুরুত্ব পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে দেখা হচ্ছে। তিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ২০১১ সালে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান তিনি। ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর থেকে তিনি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।
দলের নেতাকর্মীদের মতে, বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট ও প্রতিকূল সময়ে মির্জা ফখরুল সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি তারেক রহমানের নেতৃত্বেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
তুলনামূলকভাবে সংযত ও সজ্জন রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে যা বললেন মির্জা ফখরুল
নিজের সম্ভাব্য মনোনয়ন নিয়ে এখনো সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি মির্জা ফখরুল। মঙ্গলবার বিকেলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে এই মুহূর্তে কিছু বলার নেই। ১৩ আগস্টের পর দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বিষয়টি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামের সিদ্ধান্ত আগেই জানানো হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর বা সম্মতি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, মনোনয়ন ফরম তোলার ক্ষেত্রে স্বাক্ষর বা সম্মতির বিষয় নেই। মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার সময় স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে অতিরিক্ত আলোচনা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যানের ওপর দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনের নাম আলোচনায় থাকলেও মির্জা ফখরুলের নামই বেশি আলোচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দলীয়ভাবে আলোচনা চলছে এবং প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে আরও আলোচনা হতে পারে।
২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরাই ভোটার। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার হিসেবে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের তালিকা প্রকাশ করেছে।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এই পদ্ধতি চালু হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটের বিধান রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাজনৈতিকভাবে সীমিত।
সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমার পরই রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থীর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চিত্র স্পষ্ট হওয়ার কথা। আর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রার্থী হলে তার মন্ত্রিত্ব ও বিএনপির মহাসচিব পদে পরবর্তী পরিবর্তন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হবে।

































