রাঙামাটিতে অস্তিত্ব সংকটে বন্য হাতি
Published : ১১:৪৯, ১২ আগস্ট ২০২৬
আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্য ও পানির সংকট এবং মানুষের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এশীয় মহাবিপন্ন প্রজাতির বন্য হাতি। কাপ্তাই, লংগদু ও বরকলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাতির প্রাচীন চলাচলের করিডোর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় খাবার ও পানির সন্ধানে প্রায়ই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে হাতির পাল। এতে পাহাড়জুড়ে মানুষ ও হাতির সংঘাত দিন দিন বাড়ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বন উজাড় ও বিদ্যুতায়িত ফাঁদের কারণে গত দেড় দশকে রাঙামাটির পাহাড়ে অন্তত ১৩টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত ১০ বছরেই মারা গেছে ৮ থেকে ১০টি হাতি। একই সময়ে হাতির আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৬ জন মানুষ।
বন বিভাগের ধারণা, বর্তমানে পুরো রাঙামাটিতে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি বন্য হাতি অবশিষ্ট রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের হিসাবে, কাপ্তাই অঞ্চলে প্রায় ৩৬টি হাতি কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিচরণ করছে। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ জানিয়েছে, লংগদু ও বরকল এলাকায় সক্রিয় রয়েছে ১২ থেকে ১৫টি হাতি। এর বড় একটি অংশ লংগদু উপজেলার ভাসান্যাদম এলাকায় অবস্থান করছে।
কেন অস্তিত্ব সংকটে বন্য হাতি?
পাহাড়ে মানুষের কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতি-মানুষের সংঘাতও তীব্র হচ্ছে। পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, পর্যটনকেন্দ্র স্থাপন এবং অনিয়ন্ত্রিত বসতি গড়ে ওঠায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত হাতির চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস এবং সেগুন ও ইউক্যালিপটাসের মতো কৃত্রিম বনাঞ্চল তৈরির কারণে হাতির স্বাভাবিক খাদ্যের উৎসও কমে আসছে। শীত ও শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ি ছড়া শুকিয়ে গেলে পানির সন্ধানে হাতির পাল লোকালয়ে প্রবেশ করছে।
খাবারের সন্ধানে ফসলি জমিতে ঢুকে পড়লে কৃষকের ফসল নষ্ট হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেকে হাতি তাড়াতে গিয়ে আক্রমণ করছেন। কোথাও বিদ্যুতায়িত ফাঁদ পাতা হচ্ছে। ফলে মানুষের পাশাপাশি হাতিও প্রাণ হারাচ্ছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এশীয় হাতি সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। দ্রুত সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে রাঙামাটির পাহাড় থেকে বন্য হাতি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সুপ্রিয় চাকমা বলেন, হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থলে বন উজাড় করে বাগান, সড়ক ও বসতবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দ্রুতই হাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। হাতির খাদ্য ও চলাচলের পথ সুরক্ষিত না করলে এ প্রাণীকে বাঁচানো কঠিন হবে।
সংঘাত কমাতে সোলার ফেন্সিং
পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম সাজ্জাদ হোসেন জানান, কাপ্তাই এলাকায় হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে সোলার ফেন্সিং স্থাপনের পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
এ ছাড়া হাতির খাদ্যসংকট কমাতে তাদের পছন্দের গাছ লাগানো হচ্ছে। লোকালয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচিও পরিচালনা করা হচ্ছে, যাতে মানুষ হাতির ওপর হামলা না করে এবং সংঘাত এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাতি তাড়ানোর ব্যবস্থা নয়; দীর্ঘমেয়াদে হাতির আবাসস্থল, খাদ্য ও পানির উৎস এবং প্রাচীন চলাচলের করিডোরগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা ও ফসলের ক্ষতি কমাতে কার্যকর ক্ষতিপূরণ ও সংঘাত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই রাঙামাটির পাহাড়ে মানুষ ও বন্য হাতির সহাবস্থান সম্ভব হতে পারে।

































