সংকট মোকাবিলায় সরকারের সামনে কঠিন পথ ও চ্যালেঞ্জ

সংকট মোকাবিলায় সরকারের সামনে কঠিন পথ ও চ্যালেঞ্জ ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৪:৪০, ৪ মার্চ ২০২৬

প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসা, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, ব্যাংক খাতে উদ্বেগজনক খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল চাপে রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থির পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রভাব। সামনে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের বাস্তবতা থাকায় এখন শুধু অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ধারায় ফিরিয়ে আনা নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত এক সেমিনারে জানানো হয়, ২০২৫ অর্থবছরে দেশের বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। শিল্প ও সেবা খাতে গতি কমেছে এবং বিনিয়োগে অনীহার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছানোয় কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিলেছে। যদিও এই উত্থান কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমে এলেও সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি এখনও সীমিত। কারণ মজুরি বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম হওয়ায় আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে ভোগব্যয় কমে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ঋণপ্রবাহের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি ইঙ্গিত করে যে উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন অথবা উচ্চ সুদের হার ও ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকির কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অন্যদিকে সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়েছে, ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণসংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বা ‘ক্রাউডিং আউট’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শ্রেণিকরণ চালুর পর ৩০ শতাংশের বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি আনা হয়েছে, তবু কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে রফতানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে ধীরগতি এবং বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

একই সময়ে আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ, বিশেষত মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির কারণে। এটি উৎপাদন কার্যক্রমে কিছুটা গতি থাকার ইঙ্গিত দেয়।

পাশাপাশি বৈদেশিক কর্মসংস্থান ১৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে প্রবাসী আয় বেড়ে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রবাসী আয়ের ওপর অতিনির্ভরতা ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

সিপিডি আরও সতর্ক করেছে যে, এলডিসি উত্তরণের পর বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা কমে গেলে রফতানি খাতে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তাই রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

সার্বিকভাবে অর্থনীতি এখনো ভাঙনের মুখে না পড়লেও বহুমাত্রিক চাপের বৃত্তে আবদ্ধ রয়েছে। আস্থা পুনরুদ্ধার, নীতিগত সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। বর্তমান সময়ে নেওয়া নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি কোন পথে এগোবে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement